নামাজে আমীন নীরবে না জোরে?
‘আমীন’অর্থ হে আল্লাহ আমাদের দোয়া শুনুন
ও কবুল করুন!তা ফয়ীলুন- এর ওজনে এবং এর আলিফকে টানাও যাবে। কেউ কেউ বলেন, তা আল্লাহর নাম। এক সাহাবির আছরে এসেছে, এটি আল্লাহর সিলমোহর। তা বান্দাহর উপর আল্লাহর সিল যার মাধ্যমে বিপদ ও মসীবত দূর করা হয়। যেমন কোনো চিঠিতে সিল মারলে তা সংরক্ষিত থাকে। (বগভী, শরহুস সুন্নাহ, খ-৩ পৃ.৬৩)
সাধারণত ‘আমীন’ ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ে পড়বে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যদিও ইমাম না পড়ার কথা বলেছিলেন, পরে তা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। আস্তে ক্বেরাতের নামাজে কিন্তু মুক্তাদির ‘আমীন’ পড়তে হবে না; কেননা, তখন তারা সূরায়ে ফাতিহা শুনে না।
বর্তমানে ফরয নামাজে ইমামের পেছনে আমীন পড়া নিয়ে মতানৈক্য দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রায়ই তো নীরবে পড়ে; তবে বর্তমানে কিছু লোককে বড় করে ‘আমীন’ বলতে দেখা যায়, যার কারণে অনেক সময় ইমাম সাহেব ও অন্যান্য মুক্তাদিগণ নামাজে বিব্রত বোধ করেন।
নামাজে সূরায়ে ফাতিহা শেষে ‘আমীন’ বলা সুন্নাত; তাতে কারো দ্বিমত নেই। তেমনি ‘আমীন’ সূরায়ে ফাতিহার অংশ নয়; তাতেও কারো দ্বিমত নেই। সাধারণত ‘আমীন’ আস্তে পড়া বা বড় করে পড়া জায়েজ হওয়াতে কারো দ্বিমত নেই; তবে কোনটি উত্তম বা সুন্নাত?
১. হানাফী, মালেকী, ইমাম সুফিয়ান ছওরী, হাসান বসরী ও ইবরাহীম নখয়ীর মাযহাব মতে আমীন নীরবে পড়া সুন্নাত।
২. শাফেয়ী, হাম্বালী, আওজায়ী, ইসহাক ও আহলে হাদিছের মাযহাব মতে বড় করে বলা উত্তম বা সুন্নাত।
আমি প্রথমে হানাফি মাযহাবের দলিলসমূহ তুলে ধরব অতঃপর শাফেয়ী প্রমুখের দলিলসমূহ জবাবসহ তুলে ধরব পরিশেষে সারগর্ভ তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
হানাফী মাযহাব প্রমূখের দলিলসমূহ
১. আমীন হলো দোয়া; কেননা বর্ণিত আছে যে, হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, তখন হযরত হারুন (আ) ‘আমীন’ বললেন। তখন মহান আল্লাহ বললেন, “তোমাদের দুজনের দোয়া কবুল করা হয়েছে।” (ইউনুস, আয়াত: ৮৯)।
এবং হযরত ‘আতা বলেন, ‘আমীন’ দোয়া। (বুখারী, হাদিছ, খ-১, পৃ. ১৯৮)।
যখন ‘আমীন’ দোয়া প্রমাণিত হলো, আর দোয়ার সুন্নাত হলো নীরবে করা।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,“তোমরা তোমাদের রবের নিকট দোয়া কর অত্যন্ত বিনয় ও নিরবে। তাই ‘আমীন’ আস্তে পড়া উত্তম হবে।” (আরাফ, আয়াত: ৫৫)
২. ইমাম তিরমিযী শুবা সুত্রে বর্ণনা করেন,“হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত: নবী গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লিনপড়তেন, তখন আমীন বলতেন এবং তা নিরবে পড়তেন। (তিরমিযী, হাদিছ নং: ২৪৮; আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ১১১৭; আহমদ, হাদিছ নং: ১৯০৫৯, তাবরানী, খ-২২, পৃ. ৯; দারে কুতুনী, খ-১, পৃ. ৩৩৪।) মুসতাদরাক হাকিমে রয়েছে, তিনি বলেছেন, এ হাদিছটি শায়খানের শর্ত মোতাবেক বিশুদ্ধ। ইমাম যাহাবী তালখীছে তা স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ শুবার বর্ণনাকে ভুল বলে থাকেন তা সঠিক নয়; কেননা তিনি একজন আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিছ। (ওমদাতুল কারী শরহুল বুখারী, খ-৬, পৃ. ৫১)।যেমন, তিরমিযী শরিফে এসেছে, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি, সুফিয়ানের হাদিছ শুবার হাদিছের তুলনায় বিশুদ্ধ বেশি। শুবা এ হাদিছের কয়েকটি স্থানে ভুল করেছেন। ১. তিনি সেখানে হুজর আবিল আনবাসের কথা বলেছেন, অথচ তিনি হলেন, হুজর ইবনে আনবাস যার উপনাম আবুস সাকান ২. সেখানে তিনি আলকামা বাড়িয়েছেন অথচ তিনি সেখানে নেই ৩. তিনি সেখানে ছোট করে বলার কথা বলেছেন, অথচ তাতে বড় করে বলার কথা রয়েছে। আমি আবু জুরআ থেকে এ হাদিছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তখন তিনি বললেন, সুফিয়ানের হাদিছ বিশুদ্ধ বেশি। (তিরমিযী, খ-১, পৃ.৩৩২; হাদিছ নং: ১২৮৬)
ইমাম বুখারীর এই তিন প্রশ্নের জবাব আল্লামা নীমবী এভাবে দিয়েছেন, তিনি যে বলেছেন, হুজরের পিতার নাম আনবাস। তার উপনাম আবুল আনবাস নয়, এর উত্তর হলো, তার পিতার নাম আনবাস সাথে সাথে তার কুনিয়াতও আবুল আনবাস এবং তার জন্য অন্য কুনিয়াতও থাকতে পারে। যেমন আবুস সাকান। এদিক ইশারা করে ইবনে হিব্বান বলেন, “হুজর ইবনে আনবাস আবুস সাকান কূফী তাকেই হুজর আবুল আনবাসও বলা হয়। তিনি আলি (রা.) ও ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণনা করেন।” (ইবনু হিব্বান, খ-৪, পৃ. ১৭৭)। বরং সুফিয়ানও আবুল আনবাস দিয়ে বর্ণনা করেছেন। যেমন আবু দাঊদ শরীফে এসেছে,
“সুফিয়ান তিনি সালামা থেকে তিনি হুজর আবীল আনবাস হাযরামী থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ যখন ‘দাল্লীন’ পড়তেন, তখন বড় করে ‘আমীন’ বলতেন।” (আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৯৩২)।
এবং শুবা নয়; বরং মুহাম্মদ ইবনে কাছির, ওকী ও মুহারেবি তারা তিনজনই সুফিয়ান থেকে আবুল আনবাসশব্দ দিয়ে বর্ণনা করেছেন। ওকী ও মুহারেবির কথা দ্বারে কুতনীতে ‘তামিন’ অধ্যায়ে রয়েছে। (দ্বারু কুতুনী, হাদিছ নং: ১২৮২)।
আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো, হুজর আলকামা থেকেও শুনেছেন এবং তার পিতা থেকেও শুনেছেন। মুসনাদে আহমদে দুটিই এসেছে। তিনি বলেন, “শুবা তিনি সালামা ইবনে কুহাইল থেকে তিনি হুজর আবিল আনবাস থেকে তিনি আলকামা থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বা হুজর ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, আমাদের সাথে রাসূলুল্লাহ নামাজ পড়লেন। যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ পড়লেন তিনি বড় করে ‘আমীন’ বললেন এবং তার ডান হাত বাম হাতে রাখলেন এবং ডানে বামে সালাম ফিরালেন।” (আহমদ, হাদিছ নং: ১৮৮৫৪)
এবং ইমাম বুখারীর তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে এর দ্বারা হাদিছটি মুজতারিব প্রমাণিত হবে তখন কোনো পক্ষ তা দিয়ে দলিল দিতে পারবে না।
এবং তিনি যে বলেছেন, ছওরীর বর্ণনার প্রাধান্য হবে; তাতে সকল মুহাদ্দিছীন একমত নন। কেউ কারো থেকে কম নন। সুফিয়ানের যে মর্যাদা শুবারও সেই মর্যাদা। তিনি তো আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিছ ছিলেন; বরং চিন্তা করলে শুবার বর্ণনার প্রাধান্যতা পাওয়া যায়; কেননা, তিনি তাদলিস করতেন না। ইমাম যাহাবী তাযকিরাতুল হুফ্ফাজে তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সুফিয়ান ছওরী মাঝে মধ্যে তাদলিস করতেন। যাহাবী মীজানুল ইতিদাল কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন।
যাহাবী বলেন, আবু জায়িদ হারবী বলেন, আমি শুবাকে বলতে শুনেছি তাদলিস করার চেয়ে আমি আসমান থেকে ভেঙ্গে পড়া আমার কাছে অনেক প্রিয়। (তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ, খ-১, পৃ. ১৪৫)
যাহাবী সুফিয়ান সম্পর্কে বলেন, সুফিয়ান ইবনে সায়ীদ বিশ্বস্ত। যদিও দূর্বলদের থেকে তাদলিস করেন। কিন্তু তার সেখানে যাচাই করার যোগ্যতা আছে। যারা বলে, তিনি মিথ্যুকদের থেকেও হাদিছ তাদলিস করেন, তা সঠিক নয়। (মীজানুল ইতিদাল, খ-২, পৃ. ১৬৯)
কেউ বলেন, আলকামা তার পিতা থেকে শ্রবণ সহিহ নয়; তার পিতা তার জন্মের ছয় মাস পূর্বে মারা গেছে; তা সঠিক নয়। হাত তোলা অধ্যায়ে ইমাম নাসায়ী আলকামা তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করার হাদিছ এনেছেন; হ্যাঁ তার ছোট ভাই আবদুল জব্বার শুনে নাই। আলকামা শুনেছেন। তানকীহ প্রণেতা বলেন, শুবা থেকে সুফিয়ানের পক্ষেও দলিল পাওয়া যায়। যেমন মুসনাদে আহমদে এসেছে, “শুবা তিনি সালামা ইবনে কুহাইল থেকে তিনি হুজর আবিল আনবাস থেকে তিনি আলকামা থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, আমাদের সাথে রাসূলুল্লাহ নামাজ পড়লেন যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ পড়লেন তিনি বড় করে ‘আমীন’ বললেন এবং তার ডান হাত দিয়ে বাম হাতে রাখলেন এবং ডানে বামে সালাম ফিরালেন। (আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ১৮৮৫৪)
এর জবাবে বলা যায়, এটি আবুল ওয়ালিদের ‘শায’ বর্ণনা যার কোনো গ্রহণ যোগ্যতা নেই এবং এ হাদিছটি আবূল ওয়ালিদ থেকে ইবরাহীম ইবনে মারজুখ বর্ণনা করেছেন সে শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গেছিল। মোটামোটি কথা এ হাদিছটির সনদ সহিহ হলেও এর মতন মুজতারিব।
৩. মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “রাসূল আমাদেরকে শিক্ষা দিতেন, তোমরা ইমামের আগে বাড় না, সে যখন তাকবীর বলে, তোমরা তাকবীর বল এবং যখন ইমাম ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ বলে, তোমরা আমীন বল, আর সে যখন রুকু করে তোমরা রুকু কর এবং যখন ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলে তোমরা রাব্বানা লাকাল হামদ পড়।” (মুসলিম, হাদিছ নং: ৪১৫; ইবনু হুজাইমা, হাদিছ নং: ১৫৭৬, বগভী, হাদিছ নং: ৮৪৭) ইমাম নীমবী (রহ.) এ হাদিছের টিকায় বলেন, এই হাদিছ দ্বারা বুঝা যায়, ইমাম সাহেব আমীন বড় করে পড়বে না, নতুবা রাসূল বলতেন না, যখন ইমাম ‘ওয়ালাদ দাল্লিন’ পড়বে তোমরা আমীন বল; বরং বলতেন, যখন ইমাম আমীন বলবে, তোমরা তখন আমীন বল। (আছারুস সুনান, পৃ. ১২৩।)
৪. বুখারী শরীফে হাদিছটি এভাবে এসেছে,“হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন ইমাম সাহেব “গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন” পড়বে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল, কেননা, যার ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৪৪৭৫ ।) এখানে ইমাম আমীন নীরবে পড়ে তাই দাল্লীনের সময় আমীন বলার কথা এসেছে।
৫. ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন,“হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ আমীন বলবে এবং আসমানের ফেরেশতারা আমীন বলে তখন একটার সাথে আরেকটা মিলে যায় তখন পূর্ববতী সকল পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৭৮১; মুসলিম, হাদিছ নং: ৪১০)।
৬. মুসতাখরাজে আবী আওয়ানাতে হযরত আবু মুসা আশআরী থেকে এসেছে, হযরত আবু মূসা আশআরী বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন ইমাম ক্বিরাত পড়বে তোমরা চুপ থাক এবং যখন ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ বলবে, তোমরা ‘আমিন’ বল। (মুসতাখরাজু আবী আওয়ানা, হাদিছ নং: ১৬৯৮)
৭. আবু দাঊদ শরীফে হযরত হাসান থেকে বর্ণিত: সামুরা ইবনে জুনদাব ও ইমরান ইবনে হুসাইন পরস্পর আলোচনা করেছেন, তখন সামুরা ইবনে জুনদাব বলেন, তিনি রাসূল থেকে দুটি নিরবতা স্মরণ রেখেছেন একটি হলো, যখন তিনি তাকবীর বলতেন। আরেকটি হলো, যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লিন’ এর ক্বিরাত থেকে ফারেগ হতেন (নিরবে আমীন বলার জন্য)। সামুরা তা স্মরণ রেখেছেন। ইমরান ইবনে হুসাইন তা অস্বীকার করলেন, তখন তারা দুজনে উবাই ইবনে কাবের নিকট তা সমাধানের জন্য পেশ করলেন, তখন তিনি তাদের উত্তরে বললেন, সামুরা সঠিক। (ইমাম আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৭৭৯; আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ২০৫০৮; ইবনু হুজাইমা, হাদিছ নং: ১৫৭৮; তাবরানী, হাদিছ নং: ৬৮৭৫, দ্বারু কুতনী, খ-১, পৃ.৩৩৬, বাইহাকী, সুনানু কুবরা, হাদিছ নং: ৩২০১; বগভী, খ-৩, পৃ. ৪১।) ইমাম তিরমিযী এ হাদিছকে হাসান বলেছেন, মোল্লা আলী কারী (রহ.) মিরকাতে বলেছেন, ইবনে হাজার বলেন, হাদিছটি হাসান; বরং সহিহ। (মিরকাত, খ-২, পৃ. ৬৮০)।
৮. মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা সুত্রে বর্ণিত: “নবী ইরশাদ করেন, যখন ইমাম সাহেব“গারিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”বলবে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল, কেননা; ফেরেশতারা ‘আমীন’ বলে এবং ইমাম সাহেবও ‘আমীন’ বলে। তাই যখন তোমাদের ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তখন তার পূর্বের সকল পাপ মুছে দেওয়া হবে। (ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ৭১৮৭; নাসায়ী, হাদিছ নং: ৯২৬; দ্বারেমী, হাদিছ নং: ২৬৪৪, বগভী, হাদিছ নং: ৫৮৯) ইমাম বগভী ও আজমী বলেন হাদিছটি বিশুদ্ধ।
৯. হযরত ওমর থেকে বর্ণিত:“ইবরাহীম তিনি ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, চারটি বস্তু ইমামকে আস্তে পড়তে হয়, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আমীন ও রাব্বানা লাকাল হামদ।” (কাঞ্জুল উম্মাল, হাদিছ নং: ২২৮৯৩)
১০. হযরত ইবরাহীম সুত্রে বর্ণিত: “সুফিয়ান ছওরী তিনি মনসুর থেকে তিনি ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম পাঁচটি বিষয় নিরবে পড়বেন, আউযুবিল্লাহ, ছানা, বিসমিল্লাহ, আমীন ও রাব্বানা লাকাল হামদ।” (ইবনু আবি শায়বা, হাদিছ নং: ৮৮৪৯; আবদুর রাজ্জাক, হাদিছ নং: ২৫৯৭)
আবদুর রজ্জাক বর্ণনা করেন,“মামর ও ছওরী থেকে বর্ণিত: তারা মনসুর থেকে তারা ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ‘আমীন’ আস্তে পড়তেন।” (মুসান্নাফে আব্দুর রজ্জাক, হাদিছ নং: ২৬৩৫)।
এর সনদ সহিহ। তিনি যদিও তাবেয়ী; তবে তার কথা হানাফিদের নিকট দলিল। অর্থাৎ, যে সকল তাবেয়ীর ফতওয়া সাহাবীদের যুগে প্রসিদ্ধ ছিল এবং তার বিপরীতে কোনো মরফু হাদিছ পাওয়া না যায়, তাদের কথা দলিল হতে পারে। ইবরাহীম নখয়ী ৫০ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৯৬ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। তার জন্মও সাহাবাদের যুগে এবং মৃত্যুও সাহাবাদের যুগে। তাই তার কথা হুজ্জত হবে।
১১. যেহেতু আমীন সকলের নিকট সূরায়ে ফাতিহার অংশ নয়, তাই আমীন আস্তে পড়া উত্তম হবে; যাতে কেউ সূরায়ে ফাতিহার অংশ মনে না করে। যেমন, বিসমিল্লাহ আমরা আস্তে পড়ি সূরায়ে ফাতিহার অংশ না হওয়ার কারণে।
শাফেয়ী, হাম্বালী, আওজায়ী, ইসহাক ও আহলে হাদিছ প্রমুখের মাযহাব-এর দলিলসমূহ ও জবাব
১. ইমাম তিরমিযী হযরত সুফিয়ান সুত্রে হযরত ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন,“সুফিয়ান তিনি ওয়ায়িল ইবনে হুজর সুত্রে বর্ণনা করেন, আমি নবী থেকে শুনেছি তিনি যখন“গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”পড়তেন তখন ‘আমীন’ বলতেন এবং তা তিনি আওয়াজ টেনে পড়তেন। (তিরমিযী, হাদিছ নং: ২৪৮; ইবনু আবী শায়বা, হাদিছ নং: ৩০৭৮; আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ১৯০৪৭; আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৯৩২; নাসায়ী, হাদিছ নং: ৮৭৮; দ্বারু কুতুনী, খ-১, পৃ. ৩৩৪)।
ইমাম আবু জুরআ ও ইমাম বুখারী এই হাদিছকে অধিক বিশুদ্ধ বলেছেন, ইমাম তিরমিযী এই হাদিছকে হাসান বলেছেন।
হাফেজ তালখীছে বলেছেন, সুফিয়ানের বর্ণনাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে; কেননা তার সমর্থনে আরো দুজন ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেছেন। (তালখীছ, খ-১, পৃ. ৫৮৩)।
ফিরয়াবী বলেন, বড় করে বলাটাই বিশুদ্ধ। কেননা, সুফিয়ানের মত আলা ইবনে সালেহ ও মুহাম্মদ ইবনে সালামাহ ইবনে কুহাইল তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, হাদিছ নং: ২৫৪৬)
এর জবাব হলো: “আলা” বিশ্বস্ত ছিল না। আল্লামা যাহাবী মিজানে তাকে আবু হাতিমের বরাদ দিয়ে শিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেন। ইবনে মাদীনী বলেন, তিনি অনেক সময় মুনকার হাদিছ বর্ণনা করেন।
যাহাবী বলেন, আবু হাতিম বলেন, তিনি কূফী হাদিছ বর্ণনা করে শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। (যাহাবী, মীজানুল ইতিদাল, খ-১, পৃ. ৪২২) তবে মুহাম্মদ ইবনে সালামা ইবনে কুহাইল সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, ইবনে সাদ তাবাকাতে ও জওযানী দূর্বল বলেছেন এবং হাফিজ লিসানে ইবনে মঈন থেকে বর্ণনা করেন তিনি দূর্বল। তাই তাদের বর্ণনা দিয়ে সুফিয়ানের হাদিছকে প্রাধান্য বলা যাবে না। যাহাবী বলেন, তার মেধা কম, হাদিছ ভুলে যায়। (মীজানুল ইতিদাল, খ-৩, পৃ. ৫৬৮)
এ হাদিছের জবাব:১. হাদিছটি মুজতারিব। কেননা; এক হাদিছ তার থেকে ‘আমীন’ তিনবারের কথা এসেছে।আর তাবরানীতে এসেছে, ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত: আমি রাসূলুল্লাহ কে দেখেছি তিনি নামাজে প্রবেশ করেছেন যখন তিনি সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হলেন, তখন তিনি ‘আমীন’ তিনবার বলেছেন।(তাবরানী, খ-২২, পৃ. ২২।) আল্লামা হাইছামী মাজমাউজ জওয়াইদে-এর সনদ বিশ্বস্ত বলেছেন। হানাফিরা তাই তিনবার বলা জায়েজ মনে করেন। আবার আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাব্বিগ ফিরলী আমীন।
যেমন তাবরানী ও বায়হাকীতে এসেছে, ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত: তিনি শুনেছেন, রাসূল সূরায়ে ফাতিহা শেষে ‘রাব্বিগ ফিরলি আমীন’ বলতেন। (তাবরানী, খ-২২, পৃ. ২২) এবং ওয়ায়িল থেকে সুফিয়ান এক ধরনের বর্ণনা করেছেন, আবার শুবা ভিন্ন ধরনের। কোনোটা প্রধান্য নয়; যেমন ইমাম বুখারী ও আবু জুরআ মনে করেছেন। দুটিই মানে সমান।
এ থেকে বুঝা যায় ওয়ায়িলের হাদিছ যার উপর ভিত্তি করে বড় করে পড়ার উপর ফতওয়া দেওয়া হয় সে হাদিছটি মুজতারিব। একারণেই তো এ হাদিছকে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম তাদের সহিহাইনে আনেননি। অথচ তাদের মাযহাব তাই ছিল।
২. একজন দুজন শুনলে তাকে বড় করে পড়া বলা হয় না; বরং তখনও তা আস্তে পড়ার সীমারেখাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যেমন হাদিছে এসেছে, “হযরত আবু কাতাদাহ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ জোহর আসরের প্রথম দুরাকাতে সূরায়ে ফাতিহা ও ক্বিরাত পড়তেন মাঝে মধ্যে আমাদেরকে এক আয়াত শুনিয়ে দিতেন এবং তিনি প্রথম রাকাত লম্বা করতেন। (বুখারী, হাদিছ নং: ৮৭৮) এবং ফতওয়ায়ে শামীতে এসেছে,“নিছু স্বরে পড়ার শেষ স্তর হলো, নিজকে শুনিয়ে দেওয়া ও নিকটবর্তীকে শুনিয়ে দেওয়া। তাই এখানে এক ব্যক্তি বা দুজন শুনলে তাকে বড় করে পড়া বলা যাবে না।” (ইবনু আবেদীন শামী, খ-১, পৃ. ৫৩৪) ওয়ায়িলের কিছু বর্ণনায় যে বড় করে পড়া শব্দ উল্লেখ রয়েছে এর জবাব হলো তা অর্থ যেভাবে বুঝেছেন সেভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। যা ভুল ছিল।
৩. তাই তা বিশুদ্ধ মানলেও ব্যাখার দাবী রাখে, আর ব্যাখ্যা হলো, তা দ্বারা আলিফের আওয়াজকে টানা উদ্দেশ্য বড় করে পড়া নয় বা তা তালিমের জন্য করেছেন।
৪. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.) বলেন, বড় করে ‘আমীন’ বলা রাসূলুল্লাহ থেকে প্রমাণিত। তবে তা তিনি মাঝে মধ্যে তালীমের জন্য করেছেন, সুন্নাত হিসাবে করেননি যেরকম হযরত ওমর (রা.) ছানা মাঝে মধ্যে বড় করে পড়তেন এবং আবু হুরায়রা (রা.) আউযুবিল্লাহ মাঝে মধ্যে বড় করে পড়তেন। আল্লামা জুরজানি কাশশাফের হাশিয়ায় ও মুহাম্মদ বিরকলী তার তাফসীরে তা উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ সলফের আমল নিরবে পড়ার উপর ইবনে জরীর তাবারী ‘জাওহারে নকী’ কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন। (ফয়যুল বারী খ-৩, পৃ. ৬২)
৫. সুফিয়ানের হাদিছ দ্বারা ইমাম বড় করে পড়া প্রমাণিত হয়; তাই বলে কি মোক্তাদিদেরকেও বড় করে পড়তে হবে? ইমাম তাকবির বড় করে বলেন, আমরা কি রুকু সিজদায় যাওয়ার সময় তাকবির বড় করে পড়ি। মুক্তাদি নামাজে যা পড়েন সব তো আস্তে পড়েন। তাই ‘আমীন’ও আস্তে পড়া সুন্নাত যাতে পার্শবর্তী নামাজীরা বিব্রত বোধ না করে।
৬. এটাও বলা যেতে পারে সুফিয়ান ও শুবা দুজনের হাদিছই সঠিক এবং দুই ঘটনা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, হযরত ওয়ায়িল রাসূলুল্লাহ কে এক সময় বড় করে পড়তে দেখেছেন। যা তিনি শিক্ষার জন্য করেছেন এবং পরে তাকে আস্তে করে পড়তে দেখেছেন। তাই সুফিয়ান ছওরির ফতওয়া হলো, আস্তে পড়া।
যেমন ইবনে মুনযির বর্ণনা করেন,
“সুফিয়ান ছওরী বলেন, যখন তুমি সূরায়ে ফাতিহা পড়া থেকে ফারেগ হবে তখন ‘আমীন’ আস্তে পড়বে।” (ইবনু মুনযির, আল-আওসাত, খ-৪, পৃ. ২৮৮)
২. দ্বারে কুতনী ও হাকিম হযরত আবু হুরাইরা (র) থেকে বর্ণনা করেন, “নবী যখন সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হতেন বড় আওয়াজে ‘আমীন’ বলতেন। এর সনদ হাসান। হাকিম বলেন, হাদিছটি বুখারী-মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ। আল্লামা নীমবী বলেন, সেখানে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম ইবনে আলা জুবাইদী ইবনে জাবরীক রয়েছে। তার কোনো হাদিছ সিহাহ সিত্তাতে নেই। তাকে নাসায়ী ও আবু দাঊদ দূর্বল বলেছেন। মুহাম্মদ ইবনে আওফ তাঈ তাকে মিথ্যুক বলেছেন। তাই এসনদকে বিশ্বস্ত বলা যাবে না। (আছারুস সুনান, পৃ. ১৪০)
হাকিম যদিও এ হাদিছকে সহিহ বলেছেন; তবে তা সঠিক নয়, ইমাম দ্বারে কুতনী তার কিতাব ‘ইলালে’ তা স্বীকার করেছেন, তিনি বলেন, “জুবাইদী থেকে এ হাদিছ বর্ণনায় মতানৈক্য রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সালিম বর্ণনা করেন, তিনি যখন সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হতেন, তখন বড় আওয়াজে ‘আমীন’ বলতেন। অন্যরা বর্ণনা করেন, যখন ইমাম সাহেব আমীন বলবে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল।” (দ্বারু কুতুনী, আল ইলাল, খ-৮, পৃ. ৮৫)
তাই হাকিমের ধারণা বাতিল। আল্লামা ইবনে তুরকুমানী বলেন, “দ্বারে কুতনী একে সহিহ বলেছেন, তা সঠিক নয়; কেননা, সেখানে ইয়াহইয়া ইবনে ওছমান রয়েছে। ইবনে আবি হাতিম বলেন, সে সমালোচিত যাহাবীর কাশেফ গ্রন্থে এসেছে, তার মুনকার হাদিছ রয়েছে। তার শায়খ ইসহাক জুবাইদি। আবু দাঊদ বলেন, সে বিশ্বস্ত নয়। নাসায়ী বলেন, সে বিশ্বস্ত নয়। তাকে হিমসের মুহাদ্দিছ মুহাম্মদ ইবনে আউফ তাঈ মিথ্যুক বলেছেন।” (আল জাওহরুন নকী আলা সুনানিল বায়হাকী, খ-২, পৃ. ৫৮)
৩. ইবনে মাজাহতে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “তিনি বলেন, মানুষেরা ‘আমীন’ বলা ছেড়ে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ যখন“গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”পড়তেন, তখন ‘আমীন’ বলতেন। এমনকি তা প্রথম সফের লোকেরা শুনতেন এবং মসজিদে কম্পন সৃষ্টি হত।” (ইবনু মাজাহ, হাদিছ নং: ৫৭১)
আর এ হাদিছ সম্পর্কে আল্লামা মুগলতাই ইবনে মাজার শরাহতে লিখেন, এই হাদিছটি দুকারণে দূর্বল: সেখানে বিশর ইবনে রাফে আবুল আসবাত হারেছী রয়েছে। বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী ও আহমদ সকলে তাকে দূর্বল বলেছেন। (ওমদাতুল কারী, খ-৬, পৃ.৫১) সেখানে আরেকজন রাবী আবু আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রয়েছে সে মজহুল। আবুল হাসান ইবনে কাত্তান তার কারণে এ হাদিছকে রদ করেছেন। (মুগলতাই, শরহু সুনানি ইবনু মাজাহ, খ-১, পৃ. ১৪৪৫)এবং এ হাদিছটি আবু দাঊদ ও আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, সেখানে মসজিদ কম্পনের কথা নেই। আলবানীও এ হাদিছকে দূর্বল বলেছেন। মুসনাদে আবী ইয়ালাও এ হাদিছকে দূর্বল বলেছেন।
৪. বুখারী শরিফে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “নবী ইরশাদ করেন, যখন ইমাম ‘আমীন’ বলে, তখন তোমরা আমীন বলবে; কেননা যার ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্ববর্তী সকল পাপকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৭৮০; মুুসলিম, হাদিছ নং: ৪১০; মালিক, খ-২, পৃ. ১১৯) ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদিছটি হাসান সহিহ। (তিরমিযী, খ-১, পৃ. ৩৩৪)
এ হাদিছ দ্বারা বুঝা যায় ইমাম সাহেব আমীন বড় কর পড়বে।
জবাব: আল্লামা নীমবী আছারুস সুনানে এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, এখানে বলা হয়েছে, যখন ইমাম ‘আমীন’ বলবে, তখন ‘আমীন’ বল এবং তার থেকে বুখারী শরীফে এসেছে যখন ইমাম ‘দাল্লীন’ বলবে, তখন আমীন’ বল। তাই পারস্পরিক দ্ব›দ্ব দেখা যাচ্ছে। তাই উভয় হাদিছের সমাধান দেওয়ার জন্য বলতে হবে এখানে ইমামের ‘আমীন’ বলা রূপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে তথা যখন ইমাম সাহেব ‘আমীন’ বলার ইচ্ছা করে বা তা বলার সময় আসে তথা দাল্লিন শেষ হয়। যেমন কুরআনে এসেছে, “যখন নামাজে দাঁড়াবার ইচ্ছা করবে তখন অযূ কর।” (আছারুস সুনান, পৃ. ১৩৭) যাতে উভয় বর্ণনায় আর কোনো দ্ব›দ্ব না থাকে এবং এটাই নেওয়া ভাল হবে যাতে ইমাম মুক্তাদির ‘আমীন’ একসঙ্গে হয়। কেননা, ইমাম মুক্তাদী ও ফেরেশতাদের ‘আমীন’ একসঙ্গে হওয়াই উত্তম। তখন এ হাদিছ দ্বারা বড় করে পড়া বুঝা যাবে না।
৫. ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, “হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যখন তিনি ‘দাল্লীন’ বলেছেন তখন ‘আমিন’ বলেছেন।” (ইবনু মাজাহ, হাদিছ নং: ৮৫৪)
এখানে শ্রবণ বড় করে বলার উপর বুঝায় না; কেননা, তা কাছে থাকলে আস্তে পড়লেও শ্রবণ করা যায়। অন্য বর্ণনায় তার থেকে যে বড় করে পড়ার কথা রয়েছে তা আসলে রাবী অর্থগত বর্ণনা দিয়েছেন তার বুঝা মতে। তাই তো হযরত আলী (রা.)-এর মাযহাব আস্তে পড়া। যেমন আবী ওয়ায়িলের বর্ণনায় গেছে।
৬. দ্বারে কুতনীতে হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে এসেছে, “রাসূলুল্লাহ যখন দাল্লীন বলতেন, তখন বড় আওয়াজে আমীন বলতেন।” (দ্বারু কুতুনী, হাদিছ নং: ১২৭২) এটা দিয়েও দলিল দেওয়া যাবে না; কেননা, হযরত ওমরের আমল আস্তে পড়া যেমন পূর্বে তা গেছে। তাই তা থেকে মাঝে মধ্যে তালিমের জন্য করেছেন বলা হবে।
৭. বুখারী শরিফে তালিক সূত্রে আতা থেকে এসেছে, “আতা বলেন, আমীন দোয়া। ইবনে জুবাইর ও তার পেছনের লোকেরা ‘আমীন’ বলেছেন। এমনকি মসজিদে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে এবং আবু হুরাইরা (রা.) ইমামকে ডাক দিতেন আপনি যেন ‘আমীন’ দিয়ে আমার আগে না বাড়েন।” (বুখারী, খ-১, পৃ. ১৯৮)।
এখানে কিছু সাহাবাদের আমলের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু অধিকাংশ সাহাবাদের আমল ছিল আস্তে পড়া; তাই এটি দিয়ে দলিল দেওয়া যাবে না।
সারকথা হলো তথা বর্ণনার দিকে দুই মাযহাবই সমান; বরং হানাফী মাযহাবটি প্রাধান্য; কেননা, শুবা ‘তাদলিস’ করেন না; সুফিয়ান তাদলিস করেন। আর অর্থের দিক দিয়ে হানাফীদের দলিল মযবুত; কেননা তা কুরআনের আয়াতের সাথে দোয়ার মূলনীতিতে সামঞ্জস্য রাখে এবং হাদিছে এসেছে, জামে মামরে হাসান থেকে বর্ণিত, গোপনে দোয়া করা প্রকাশ্যে সত্তর বার দোয়া করার সমান। (মামর, জামিউ মামর, হাদিছ নং: ১৯৬৪৫; আসবাহানী, আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ-২, পৃ. ২৬১)
ইবনে হিব্বানে এসেছে, আমীন আউযুবিল্লাহ থেকে উত্তম নয়; কেননা আউযুবিল্লাহ পড়ার জন্য তো কুরআনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু আমীন পড়ার জন্য কুরআনে নির্দেশ নেই; বরং প্রসিদ্ধ মত মতে তা আরবী শব্দও নয়। তাই যখন আউযুবিল্লাহ আস্তে পড়ি ‘আমীন’ কেন আস্তে পড়ব না। মুক্তাদি তো কোনো কিছু বড় করে পড়ে না; তাই এটাও আস্তে পড়বে এবং আস্তে পড়াটা যুক্তি ভিত্তিক এবং অধিকাংশ সাহাবা ও তাবেয়ীদের আমল তাই ছিল। যেমন জওহরে নকী কিতাবে এসেছে, সঠিক কথা হলো, দুটিই জায়েজ। যদিও আস্তে পড়া উত্তম; কেননা, অধিকাংশ সাহাবা ও তাবেয়ীনের আমল তাই ছিল। (আল জওহারুন নকী, খ-২, পৃ. ৫৮)
আল্লামা আনোয়ারশাহ কাশ্মীরী (রহ.) আরও বলেন, এমন কোনো হাদিছ পাওয়া যাবে না যেখানে রাসূলুল্লাহ আমীন বড় করে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন; বরং যারা পড়েছেন প্রত্যেকে তারা নিজের রায় দ্বারা পড়েছেন। আর সুফিয়ানের হাদিছ বলেন বা শুবার হাদিছ বলেন, কোনোটি রাসূলের নিয়মিত ‘আমীন’ বলা বুঝায় না; বরং তারা কোন একসময় দেখেছেন বা শুনেছেন তা বর্ণনা করেছেন। কেননা, ওয়ায়িল ইয়ামনী ছিলেন। তিনি সেখান থেকে মাত্র কয়েকবার মদীনায় এসেছেন। তাই আমরা উভয় প্রকার হাদিছ দ্বারা উভয় প্রকারভাবে পড়া জায়েয মনে করি। কিন্তু লাগাতার এভাবে পড়া হাদিছ দ্বারা বুঝা যায় না। তাই আমরা তা কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ করে বলি আস্তে ও বড় করে পড়া উভয়টি জায়েয; তবে যেহেতু আমীন দোয়া এবং দোয়ার মূল ও আসল হলো নীরবে করা; তাই নীরবে পড়া উত্তম ও সুন্নাত হবে। (ফয়যুল বারী, খ-৩, পৃ. ৬৭)
মুসলিম উম্মাহর চলার পথ: আমীন পড়ার ব্যাপারে যে সকল হাদিছ বিশুদ্ধ তা আস্তে বা বড় করে পড়ার ব্যাপারে স্পষ্ট নয়, আর যে সকল হাদিছ আস্তে বা বড় করে পড়ার ব্যাপারে স্পষ্ট তা দূর্বল। সুফিয়ান ও শুবার হাদিছ দুটি সমান বিশুদ্ধ ও মুজতারিব। এই দুই হাদিছ দ্বারা কোনো একটিকে সুন্নাত প্রমাণ করা যাবে না, জায়েয প্রমাণ করা যাবে। তবে অধিকাংশ সাহাবাদের আমল ও দোয়ার সুন্নাত আস্তে পড়া হিসেবে তাও অন্যান্য যিকর ও দোয়ার মত আস্তে পড়া সুন্নাত হবে। তবে কমপক্ষে নিজে শুনে মত আওয়াজ হওয়া চায়। বড় করে পড়া জায়েজ হবে। তাই এ সাধারণ বিষয় নিয়ে ফিতনা সৃষ্টি করা অনুত্তম হবে। যেহেতু দুটোই শরীয়তে স্বীকৃত; তাই যে অঞ্চলে যে সুন্নাহ প্রচলিত সেখানে সেটিই চলতে দেওয়া উচিত। প্রচলিত সুন্নাহকে প্রত্যাখান করে তার স্থলে ভিন্ন সুন্নাহ জারি করার প্রচেষ্টা শরীয়তের নীতি ও স্বভাবের পরিপন্থী। মুসলমানদের ঐক্য ও শৃঙ্খলার পক্ষেও ক্ষতিকর। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয় বিদআতের ক্ষেত্রে; সুন্নাহর ক্ষেত্রে নয়। তাই প্রান্তিকতা পরিত্যাজ্য।
ও কবুল করুন!তা ফয়ীলুন- এর ওজনে এবং এর আলিফকে টানাও যাবে। কেউ কেউ বলেন, তা আল্লাহর নাম। এক সাহাবির আছরে এসেছে, এটি আল্লাহর সিলমোহর। তা বান্দাহর উপর আল্লাহর সিল যার মাধ্যমে বিপদ ও মসীবত দূর করা হয়। যেমন কোনো চিঠিতে সিল মারলে তা সংরক্ষিত থাকে। (বগভী, শরহুস সুন্নাহ, খ-৩ পৃ.৬৩)
সাধারণত ‘আমীন’ ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ে পড়বে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যদিও ইমাম না পড়ার কথা বলেছিলেন, পরে তা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। আস্তে ক্বেরাতের নামাজে কিন্তু মুক্তাদির ‘আমীন’ পড়তে হবে না; কেননা, তখন তারা সূরায়ে ফাতিহা শুনে না।
বর্তমানে ফরয নামাজে ইমামের পেছনে আমীন পড়া নিয়ে মতানৈক্য দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রায়ই তো নীরবে পড়ে; তবে বর্তমানে কিছু লোককে বড় করে ‘আমীন’ বলতে দেখা যায়, যার কারণে অনেক সময় ইমাম সাহেব ও অন্যান্য মুক্তাদিগণ নামাজে বিব্রত বোধ করেন।
নামাজে সূরায়ে ফাতিহা শেষে ‘আমীন’ বলা সুন্নাত; তাতে কারো দ্বিমত নেই। তেমনি ‘আমীন’ সূরায়ে ফাতিহার অংশ নয়; তাতেও কারো দ্বিমত নেই। সাধারণত ‘আমীন’ আস্তে পড়া বা বড় করে পড়া জায়েজ হওয়াতে কারো দ্বিমত নেই; তবে কোনটি উত্তম বা সুন্নাত?
১. হানাফী, মালেকী, ইমাম সুফিয়ান ছওরী, হাসান বসরী ও ইবরাহীম নখয়ীর মাযহাব মতে আমীন নীরবে পড়া সুন্নাত।
২. শাফেয়ী, হাম্বালী, আওজায়ী, ইসহাক ও আহলে হাদিছের মাযহাব মতে বড় করে বলা উত্তম বা সুন্নাত।
আমি প্রথমে হানাফি মাযহাবের দলিলসমূহ তুলে ধরব অতঃপর শাফেয়ী প্রমুখের দলিলসমূহ জবাবসহ তুলে ধরব পরিশেষে সারগর্ভ তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
হানাফী মাযহাব প্রমূখের দলিলসমূহ
১. আমীন হলো দোয়া; কেননা বর্ণিত আছে যে, হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, তখন হযরত হারুন (আ) ‘আমীন’ বললেন। তখন মহান আল্লাহ বললেন, “তোমাদের দুজনের দোয়া কবুল করা হয়েছে।” (ইউনুস, আয়াত: ৮৯)।
এবং হযরত ‘আতা বলেন, ‘আমীন’ দোয়া। (বুখারী, হাদিছ, খ-১, পৃ. ১৯৮)।
যখন ‘আমীন’ দোয়া প্রমাণিত হলো, আর দোয়ার সুন্নাত হলো নীরবে করা।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,“তোমরা তোমাদের রবের নিকট দোয়া কর অত্যন্ত বিনয় ও নিরবে। তাই ‘আমীন’ আস্তে পড়া উত্তম হবে।” (আরাফ, আয়াত: ৫৫)
২. ইমাম তিরমিযী শুবা সুত্রে বর্ণনা করেন,“হযরত ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত: নবী গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লিনপড়তেন, তখন আমীন বলতেন এবং তা নিরবে পড়তেন। (তিরমিযী, হাদিছ নং: ২৪৮; আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ১১১৭; আহমদ, হাদিছ নং: ১৯০৫৯, তাবরানী, খ-২২, পৃ. ৯; দারে কুতুনী, খ-১, পৃ. ৩৩৪।) মুসতাদরাক হাকিমে রয়েছে, তিনি বলেছেন, এ হাদিছটি শায়খানের শর্ত মোতাবেক বিশুদ্ধ। ইমাম যাহাবী তালখীছে তা স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ শুবার বর্ণনাকে ভুল বলে থাকেন তা সঠিক নয়; কেননা তিনি একজন আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিছ। (ওমদাতুল কারী শরহুল বুখারী, খ-৬, পৃ. ৫১)।যেমন, তিরমিযী শরিফে এসেছে, আমি ইমাম বুখারীকে বলতে শুনেছি, সুফিয়ানের হাদিছ শুবার হাদিছের তুলনায় বিশুদ্ধ বেশি। শুবা এ হাদিছের কয়েকটি স্থানে ভুল করেছেন। ১. তিনি সেখানে হুজর আবিল আনবাসের কথা বলেছেন, অথচ তিনি হলেন, হুজর ইবনে আনবাস যার উপনাম আবুস সাকান ২. সেখানে তিনি আলকামা বাড়িয়েছেন অথচ তিনি সেখানে নেই ৩. তিনি সেখানে ছোট করে বলার কথা বলেছেন, অথচ তাতে বড় করে বলার কথা রয়েছে। আমি আবু জুরআ থেকে এ হাদিছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তখন তিনি বললেন, সুফিয়ানের হাদিছ বিশুদ্ধ বেশি। (তিরমিযী, খ-১, পৃ.৩৩২; হাদিছ নং: ১২৮৬)
ইমাম বুখারীর এই তিন প্রশ্নের জবাব আল্লামা নীমবী এভাবে দিয়েছেন, তিনি যে বলেছেন, হুজরের পিতার নাম আনবাস। তার উপনাম আবুল আনবাস নয়, এর উত্তর হলো, তার পিতার নাম আনবাস সাথে সাথে তার কুনিয়াতও আবুল আনবাস এবং তার জন্য অন্য কুনিয়াতও থাকতে পারে। যেমন আবুস সাকান। এদিক ইশারা করে ইবনে হিব্বান বলেন, “হুজর ইবনে আনবাস আবুস সাকান কূফী তাকেই হুজর আবুল আনবাসও বলা হয়। তিনি আলি (রা.) ও ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণনা করেন।” (ইবনু হিব্বান, খ-৪, পৃ. ১৭৭)। বরং সুফিয়ানও আবুল আনবাস দিয়ে বর্ণনা করেছেন। যেমন আবু দাঊদ শরীফে এসেছে,
“সুফিয়ান তিনি সালামা থেকে তিনি হুজর আবীল আনবাস হাযরামী থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ যখন ‘দাল্লীন’ পড়তেন, তখন বড় করে ‘আমীন’ বলতেন।” (আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৯৩২)।
এবং শুবা নয়; বরং মুহাম্মদ ইবনে কাছির, ওকী ও মুহারেবি তারা তিনজনই সুফিয়ান থেকে আবুল আনবাসশব্দ দিয়ে বর্ণনা করেছেন। ওকী ও মুহারেবির কথা দ্বারে কুতনীতে ‘তামিন’ অধ্যায়ে রয়েছে। (দ্বারু কুতুনী, হাদিছ নং: ১২৮২)।
আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো, হুজর আলকামা থেকেও শুনেছেন এবং তার পিতা থেকেও শুনেছেন। মুসনাদে আহমদে দুটিই এসেছে। তিনি বলেন, “শুবা তিনি সালামা ইবনে কুহাইল থেকে তিনি হুজর আবিল আনবাস থেকে তিনি আলকামা থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বা হুজর ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, আমাদের সাথে রাসূলুল্লাহ নামাজ পড়লেন। যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ পড়লেন তিনি বড় করে ‘আমীন’ বললেন এবং তার ডান হাত বাম হাতে রাখলেন এবং ডানে বামে সালাম ফিরালেন।” (আহমদ, হাদিছ নং: ১৮৮৫৪)
এবং ইমাম বুখারীর তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে এর দ্বারা হাদিছটি মুজতারিব প্রমাণিত হবে তখন কোনো পক্ষ তা দিয়ে দলিল দিতে পারবে না।
এবং তিনি যে বলেছেন, ছওরীর বর্ণনার প্রাধান্য হবে; তাতে সকল মুহাদ্দিছীন একমত নন। কেউ কারো থেকে কম নন। সুফিয়ানের যে মর্যাদা শুবারও সেই মর্যাদা। তিনি তো আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিছ ছিলেন; বরং চিন্তা করলে শুবার বর্ণনার প্রাধান্যতা পাওয়া যায়; কেননা, তিনি তাদলিস করতেন না। ইমাম যাহাবী তাযকিরাতুল হুফ্ফাজে তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সুফিয়ান ছওরী মাঝে মধ্যে তাদলিস করতেন। যাহাবী মীজানুল ইতিদাল কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন।
যাহাবী বলেন, আবু জায়িদ হারবী বলেন, আমি শুবাকে বলতে শুনেছি তাদলিস করার চেয়ে আমি আসমান থেকে ভেঙ্গে পড়া আমার কাছে অনেক প্রিয়। (তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ, খ-১, পৃ. ১৪৫)
যাহাবী সুফিয়ান সম্পর্কে বলেন, সুফিয়ান ইবনে সায়ীদ বিশ্বস্ত। যদিও দূর্বলদের থেকে তাদলিস করেন। কিন্তু তার সেখানে যাচাই করার যোগ্যতা আছে। যারা বলে, তিনি মিথ্যুকদের থেকেও হাদিছ তাদলিস করেন, তা সঠিক নয়। (মীজানুল ইতিদাল, খ-২, পৃ. ১৬৯)
কেউ বলেন, আলকামা তার পিতা থেকে শ্রবণ সহিহ নয়; তার পিতা তার জন্মের ছয় মাস পূর্বে মারা গেছে; তা সঠিক নয়। হাত তোলা অধ্যায়ে ইমাম নাসায়ী আলকামা তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করার হাদিছ এনেছেন; হ্যাঁ তার ছোট ভাই আবদুল জব্বার শুনে নাই। আলকামা শুনেছেন। তানকীহ প্রণেতা বলেন, শুবা থেকে সুফিয়ানের পক্ষেও দলিল পাওয়া যায়। যেমন মুসনাদে আহমদে এসেছে, “শুবা তিনি সালামা ইবনে কুহাইল থেকে তিনি হুজর আবিল আনবাস থেকে তিনি আলকামা থেকে তিনি ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন, আমাদের সাথে রাসূলুল্লাহ নামাজ পড়লেন যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ পড়লেন তিনি বড় করে ‘আমীন’ বললেন এবং তার ডান হাত দিয়ে বাম হাতে রাখলেন এবং ডানে বামে সালাম ফিরালেন। (আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ১৮৮৫৪)
এর জবাবে বলা যায়, এটি আবুল ওয়ালিদের ‘শায’ বর্ণনা যার কোনো গ্রহণ যোগ্যতা নেই এবং এ হাদিছটি আবূল ওয়ালিদ থেকে ইবরাহীম ইবনে মারজুখ বর্ণনা করেছেন সে শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গেছিল। মোটামোটি কথা এ হাদিছটির সনদ সহিহ হলেও এর মতন মুজতারিব।
৩. মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “রাসূল আমাদেরকে শিক্ষা দিতেন, তোমরা ইমামের আগে বাড় না, সে যখন তাকবীর বলে, তোমরা তাকবীর বল এবং যখন ইমাম ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ বলে, তোমরা আমীন বল, আর সে যখন রুকু করে তোমরা রুকু কর এবং যখন ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলে তোমরা রাব্বানা লাকাল হামদ পড়।” (মুসলিম, হাদিছ নং: ৪১৫; ইবনু হুজাইমা, হাদিছ নং: ১৫৭৬, বগভী, হাদিছ নং: ৮৪৭) ইমাম নীমবী (রহ.) এ হাদিছের টিকায় বলেন, এই হাদিছ দ্বারা বুঝা যায়, ইমাম সাহেব আমীন বড় করে পড়বে না, নতুবা রাসূল বলতেন না, যখন ইমাম ‘ওয়ালাদ দাল্লিন’ পড়বে তোমরা আমীন বল; বরং বলতেন, যখন ইমাম আমীন বলবে, তোমরা তখন আমীন বল। (আছারুস সুনান, পৃ. ১২৩।)
৪. বুখারী শরীফে হাদিছটি এভাবে এসেছে,“হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন ইমাম সাহেব “গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন” পড়বে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল, কেননা, যার ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৪৪৭৫ ।) এখানে ইমাম আমীন নীরবে পড়ে তাই দাল্লীনের সময় আমীন বলার কথা এসেছে।
৫. ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন,“হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ আমীন বলবে এবং আসমানের ফেরেশতারা আমীন বলে তখন একটার সাথে আরেকটা মিলে যায় তখন পূর্ববতী সকল পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৭৮১; মুসলিম, হাদিছ নং: ৪১০)।
৬. মুসতাখরাজে আবী আওয়ানাতে হযরত আবু মুসা আশআরী থেকে এসেছে, হযরত আবু মূসা আশআরী বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, যখন ইমাম ক্বিরাত পড়বে তোমরা চুপ থাক এবং যখন ‘ওয়ালাদ দাল্লীন’ বলবে, তোমরা ‘আমিন’ বল। (মুসতাখরাজু আবী আওয়ানা, হাদিছ নং: ১৬৯৮)
৭. আবু দাঊদ শরীফে হযরত হাসান থেকে বর্ণিত: সামুরা ইবনে জুনদাব ও ইমরান ইবনে হুসাইন পরস্পর আলোচনা করেছেন, তখন সামুরা ইবনে জুনদাব বলেন, তিনি রাসূল থেকে দুটি নিরবতা স্মরণ রেখেছেন একটি হলো, যখন তিনি তাকবীর বলতেন। আরেকটি হলো, যখন তিনি ‘ওয়ালাদ দাল্লিন’ এর ক্বিরাত থেকে ফারেগ হতেন (নিরবে আমীন বলার জন্য)। সামুরা তা স্মরণ রেখেছেন। ইমরান ইবনে হুসাইন তা অস্বীকার করলেন, তখন তারা দুজনে উবাই ইবনে কাবের নিকট তা সমাধানের জন্য পেশ করলেন, তখন তিনি তাদের উত্তরে বললেন, সামুরা সঠিক। (ইমাম আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৭৭৯; আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ২০৫০৮; ইবনু হুজাইমা, হাদিছ নং: ১৫৭৮; তাবরানী, হাদিছ নং: ৬৮৭৫, দ্বারু কুতনী, খ-১, পৃ.৩৩৬, বাইহাকী, সুনানু কুবরা, হাদিছ নং: ৩২০১; বগভী, খ-৩, পৃ. ৪১।) ইমাম তিরমিযী এ হাদিছকে হাসান বলেছেন, মোল্লা আলী কারী (রহ.) মিরকাতে বলেছেন, ইবনে হাজার বলেন, হাদিছটি হাসান; বরং সহিহ। (মিরকাত, খ-২, পৃ. ৬৮০)।
৮. মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা সুত্রে বর্ণিত: “নবী ইরশাদ করেন, যখন ইমাম সাহেব“গারিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”বলবে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল, কেননা; ফেরেশতারা ‘আমীন’ বলে এবং ইমাম সাহেবও ‘আমীন’ বলে। তাই যখন তোমাদের ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তখন তার পূর্বের সকল পাপ মুছে দেওয়া হবে। (ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ৭১৮৭; নাসায়ী, হাদিছ নং: ৯২৬; দ্বারেমী, হাদিছ নং: ২৬৪৪, বগভী, হাদিছ নং: ৫৮৯) ইমাম বগভী ও আজমী বলেন হাদিছটি বিশুদ্ধ।
৯. হযরত ওমর থেকে বর্ণিত:“ইবরাহীম তিনি ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, চারটি বস্তু ইমামকে আস্তে পড়তে হয়, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আমীন ও রাব্বানা লাকাল হামদ।” (কাঞ্জুল উম্মাল, হাদিছ নং: ২২৮৯৩)
১০. হযরত ইবরাহীম সুত্রে বর্ণিত: “সুফিয়ান ছওরী তিনি মনসুর থেকে তিনি ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম পাঁচটি বিষয় নিরবে পড়বেন, আউযুবিল্লাহ, ছানা, বিসমিল্লাহ, আমীন ও রাব্বানা লাকাল হামদ।” (ইবনু আবি শায়বা, হাদিছ নং: ৮৮৪৯; আবদুর রাজ্জাক, হাদিছ নং: ২৫৯৭)
আবদুর রজ্জাক বর্ণনা করেন,“মামর ও ছওরী থেকে বর্ণিত: তারা মনসুর থেকে তারা ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ‘আমীন’ আস্তে পড়তেন।” (মুসান্নাফে আব্দুর রজ্জাক, হাদিছ নং: ২৬৩৫)।
এর সনদ সহিহ। তিনি যদিও তাবেয়ী; তবে তার কথা হানাফিদের নিকট দলিল। অর্থাৎ, যে সকল তাবেয়ীর ফতওয়া সাহাবীদের যুগে প্রসিদ্ধ ছিল এবং তার বিপরীতে কোনো মরফু হাদিছ পাওয়া না যায়, তাদের কথা দলিল হতে পারে। ইবরাহীম নখয়ী ৫০ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৯৬ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। তার জন্মও সাহাবাদের যুগে এবং মৃত্যুও সাহাবাদের যুগে। তাই তার কথা হুজ্জত হবে।
১১. যেহেতু আমীন সকলের নিকট সূরায়ে ফাতিহার অংশ নয়, তাই আমীন আস্তে পড়া উত্তম হবে; যাতে কেউ সূরায়ে ফাতিহার অংশ মনে না করে। যেমন, বিসমিল্লাহ আমরা আস্তে পড়ি সূরায়ে ফাতিহার অংশ না হওয়ার কারণে।
শাফেয়ী, হাম্বালী, আওজায়ী, ইসহাক ও আহলে হাদিছ প্রমুখের মাযহাব-এর দলিলসমূহ ও জবাব
১. ইমাম তিরমিযী হযরত সুফিয়ান সুত্রে হযরত ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেন,“সুফিয়ান তিনি ওয়ায়িল ইবনে হুজর সুত্রে বর্ণনা করেন, আমি নবী থেকে শুনেছি তিনি যখন“গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”পড়তেন তখন ‘আমীন’ বলতেন এবং তা তিনি আওয়াজ টেনে পড়তেন। (তিরমিযী, হাদিছ নং: ২৪৮; ইবনু আবী শায়বা, হাদিছ নং: ৩০৭৮; আহমদ ইবনু হাম্বাল, হাদিছ নং: ১৯০৪৭; আবু দাঊদ, হাদিছ নং: ৯৩২; নাসায়ী, হাদিছ নং: ৮৭৮; দ্বারু কুতুনী, খ-১, পৃ. ৩৩৪)।
ইমাম আবু জুরআ ও ইমাম বুখারী এই হাদিছকে অধিক বিশুদ্ধ বলেছেন, ইমাম তিরমিযী এই হাদিছকে হাসান বলেছেন।
হাফেজ তালখীছে বলেছেন, সুফিয়ানের বর্ণনাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে; কেননা তার সমর্থনে আরো দুজন ওয়ায়িল থেকে বর্ণনা করেছেন। (তালখীছ, খ-১, পৃ. ৫৮৩)।
ফিরয়াবী বলেন, বড় করে বলাটাই বিশুদ্ধ। কেননা, সুফিয়ানের মত আলা ইবনে সালেহ ও মুহাম্মদ ইবনে সালামাহ ইবনে কুহাইল তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, হাদিছ নং: ২৫৪৬)
এর জবাব হলো: “আলা” বিশ্বস্ত ছিল না। আল্লামা যাহাবী মিজানে তাকে আবু হাতিমের বরাদ দিয়ে শিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেন। ইবনে মাদীনী বলেন, তিনি অনেক সময় মুনকার হাদিছ বর্ণনা করেন।
যাহাবী বলেন, আবু হাতিম বলেন, তিনি কূফী হাদিছ বর্ণনা করে শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। (যাহাবী, মীজানুল ইতিদাল, খ-১, পৃ. ৪২২) তবে মুহাম্মদ ইবনে সালামা ইবনে কুহাইল সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, ইবনে সাদ তাবাকাতে ও জওযানী দূর্বল বলেছেন এবং হাফিজ লিসানে ইবনে মঈন থেকে বর্ণনা করেন তিনি দূর্বল। তাই তাদের বর্ণনা দিয়ে সুফিয়ানের হাদিছকে প্রাধান্য বলা যাবে না। যাহাবী বলেন, তার মেধা কম, হাদিছ ভুলে যায়। (মীজানুল ইতিদাল, খ-৩, পৃ. ৫৬৮)
এ হাদিছের জবাব:১. হাদিছটি মুজতারিব। কেননা; এক হাদিছ তার থেকে ‘আমীন’ তিনবারের কথা এসেছে।আর তাবরানীতে এসেছে, ওয়ায়িল থেকে বর্ণিত: আমি রাসূলুল্লাহ কে দেখেছি তিনি নামাজে প্রবেশ করেছেন যখন তিনি সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হলেন, তখন তিনি ‘আমীন’ তিনবার বলেছেন।(তাবরানী, খ-২২, পৃ. ২২।) আল্লামা হাইছামী মাজমাউজ জওয়াইদে-এর সনদ বিশ্বস্ত বলেছেন। হানাফিরা তাই তিনবার বলা জায়েজ মনে করেন। আবার আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাব্বিগ ফিরলী আমীন।
যেমন তাবরানী ও বায়হাকীতে এসেছে, ওয়ায়িল ইবনে হুজর থেকে বর্ণিত: তিনি শুনেছেন, রাসূল সূরায়ে ফাতিহা শেষে ‘রাব্বিগ ফিরলি আমীন’ বলতেন। (তাবরানী, খ-২২, পৃ. ২২) এবং ওয়ায়িল থেকে সুফিয়ান এক ধরনের বর্ণনা করেছেন, আবার শুবা ভিন্ন ধরনের। কোনোটা প্রধান্য নয়; যেমন ইমাম বুখারী ও আবু জুরআ মনে করেছেন। দুটিই মানে সমান।
এ থেকে বুঝা যায় ওয়ায়িলের হাদিছ যার উপর ভিত্তি করে বড় করে পড়ার উপর ফতওয়া দেওয়া হয় সে হাদিছটি মুজতারিব। একারণেই তো এ হাদিছকে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম তাদের সহিহাইনে আনেননি। অথচ তাদের মাযহাব তাই ছিল।
২. একজন দুজন শুনলে তাকে বড় করে পড়া বলা হয় না; বরং তখনও তা আস্তে পড়ার সীমারেখাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যেমন হাদিছে এসেছে, “হযরত আবু কাতাদাহ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ জোহর আসরের প্রথম দুরাকাতে সূরায়ে ফাতিহা ও ক্বিরাত পড়তেন মাঝে মধ্যে আমাদেরকে এক আয়াত শুনিয়ে দিতেন এবং তিনি প্রথম রাকাত লম্বা করতেন। (বুখারী, হাদিছ নং: ৮৭৮) এবং ফতওয়ায়ে শামীতে এসেছে,“নিছু স্বরে পড়ার শেষ স্তর হলো, নিজকে শুনিয়ে দেওয়া ও নিকটবর্তীকে শুনিয়ে দেওয়া। তাই এখানে এক ব্যক্তি বা দুজন শুনলে তাকে বড় করে পড়া বলা যাবে না।” (ইবনু আবেদীন শামী, খ-১, পৃ. ৫৩৪) ওয়ায়িলের কিছু বর্ণনায় যে বড় করে পড়া শব্দ উল্লেখ রয়েছে এর জবাব হলো তা অর্থ যেভাবে বুঝেছেন সেভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। যা ভুল ছিল।
৩. তাই তা বিশুদ্ধ মানলেও ব্যাখার দাবী রাখে, আর ব্যাখ্যা হলো, তা দ্বারা আলিফের আওয়াজকে টানা উদ্দেশ্য বড় করে পড়া নয় বা তা তালিমের জন্য করেছেন।
৪. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.) বলেন, বড় করে ‘আমীন’ বলা রাসূলুল্লাহ থেকে প্রমাণিত। তবে তা তিনি মাঝে মধ্যে তালীমের জন্য করেছেন, সুন্নাত হিসাবে করেননি যেরকম হযরত ওমর (রা.) ছানা মাঝে মধ্যে বড় করে পড়তেন এবং আবু হুরায়রা (রা.) আউযুবিল্লাহ মাঝে মধ্যে বড় করে পড়তেন। আল্লামা জুরজানি কাশশাফের হাশিয়ায় ও মুহাম্মদ বিরকলী তার তাফসীরে তা উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ সলফের আমল নিরবে পড়ার উপর ইবনে জরীর তাবারী ‘জাওহারে নকী’ কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন। (ফয়যুল বারী খ-৩, পৃ. ৬২)
৫. সুফিয়ানের হাদিছ দ্বারা ইমাম বড় করে পড়া প্রমাণিত হয়; তাই বলে কি মোক্তাদিদেরকেও বড় করে পড়তে হবে? ইমাম তাকবির বড় করে বলেন, আমরা কি রুকু সিজদায় যাওয়ার সময় তাকবির বড় করে পড়ি। মুক্তাদি নামাজে যা পড়েন সব তো আস্তে পড়েন। তাই ‘আমীন’ও আস্তে পড়া সুন্নাত যাতে পার্শবর্তী নামাজীরা বিব্রত বোধ না করে।
৬. এটাও বলা যেতে পারে সুফিয়ান ও শুবা দুজনের হাদিছই সঠিক এবং দুই ঘটনা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, হযরত ওয়ায়িল রাসূলুল্লাহ কে এক সময় বড় করে পড়তে দেখেছেন। যা তিনি শিক্ষার জন্য করেছেন এবং পরে তাকে আস্তে করে পড়তে দেখেছেন। তাই সুফিয়ান ছওরির ফতওয়া হলো, আস্তে পড়া।
যেমন ইবনে মুনযির বর্ণনা করেন,
“সুফিয়ান ছওরী বলেন, যখন তুমি সূরায়ে ফাতিহা পড়া থেকে ফারেগ হবে তখন ‘আমীন’ আস্তে পড়বে।” (ইবনু মুনযির, আল-আওসাত, খ-৪, পৃ. ২৮৮)
২. দ্বারে কুতনী ও হাকিম হযরত আবু হুরাইরা (র) থেকে বর্ণনা করেন, “নবী যখন সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হতেন বড় আওয়াজে ‘আমীন’ বলতেন। এর সনদ হাসান। হাকিম বলেন, হাদিছটি বুখারী-মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ। আল্লামা নীমবী বলেন, সেখানে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম ইবনে আলা জুবাইদী ইবনে জাবরীক রয়েছে। তার কোনো হাদিছ সিহাহ সিত্তাতে নেই। তাকে নাসায়ী ও আবু দাঊদ দূর্বল বলেছেন। মুহাম্মদ ইবনে আওফ তাঈ তাকে মিথ্যুক বলেছেন। তাই এসনদকে বিশ্বস্ত বলা যাবে না। (আছারুস সুনান, পৃ. ১৪০)
হাকিম যদিও এ হাদিছকে সহিহ বলেছেন; তবে তা সঠিক নয়, ইমাম দ্বারে কুতনী তার কিতাব ‘ইলালে’ তা স্বীকার করেছেন, তিনি বলেন, “জুবাইদী থেকে এ হাদিছ বর্ণনায় মতানৈক্য রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সালিম বর্ণনা করেন, তিনি যখন সূরায়ে ফাতিহা থেকে ফারেগ হতেন, তখন বড় আওয়াজে ‘আমীন’ বলতেন। অন্যরা বর্ণনা করেন, যখন ইমাম সাহেব আমীন বলবে, তখন তোমরা ‘আমীন’ বল।” (দ্বারু কুতুনী, আল ইলাল, খ-৮, পৃ. ৮৫)
তাই হাকিমের ধারণা বাতিল। আল্লামা ইবনে তুরকুমানী বলেন, “দ্বারে কুতনী একে সহিহ বলেছেন, তা সঠিক নয়; কেননা, সেখানে ইয়াহইয়া ইবনে ওছমান রয়েছে। ইবনে আবি হাতিম বলেন, সে সমালোচিত যাহাবীর কাশেফ গ্রন্থে এসেছে, তার মুনকার হাদিছ রয়েছে। তার শায়খ ইসহাক জুবাইদি। আবু দাঊদ বলেন, সে বিশ্বস্ত নয়। নাসায়ী বলেন, সে বিশ্বস্ত নয়। তাকে হিমসের মুহাদ্দিছ মুহাম্মদ ইবনে আউফ তাঈ মিথ্যুক বলেছেন।” (আল জাওহরুন নকী আলা সুনানিল বায়হাকী, খ-২, পৃ. ৫৮)
৩. ইবনে মাজাহতে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “তিনি বলেন, মানুষেরা ‘আমীন’ বলা ছেড়ে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ যখন“গাইরিল মাগদুবী ওয়ালাদ দাল্লীন”পড়তেন, তখন ‘আমীন’ বলতেন। এমনকি তা প্রথম সফের লোকেরা শুনতেন এবং মসজিদে কম্পন সৃষ্টি হত।” (ইবনু মাজাহ, হাদিছ নং: ৫৭১)
আর এ হাদিছ সম্পর্কে আল্লামা মুগলতাই ইবনে মাজার শরাহতে লিখেন, এই হাদিছটি দুকারণে দূর্বল: সেখানে বিশর ইবনে রাফে আবুল আসবাত হারেছী রয়েছে। বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী ও আহমদ সকলে তাকে দূর্বল বলেছেন। (ওমদাতুল কারী, খ-৬, পৃ.৫১) সেখানে আরেকজন রাবী আবু আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রয়েছে সে মজহুল। আবুল হাসান ইবনে কাত্তান তার কারণে এ হাদিছকে রদ করেছেন। (মুগলতাই, শরহু সুনানি ইবনু মাজাহ, খ-১, পৃ. ১৪৪৫)এবং এ হাদিছটি আবু দাঊদ ও আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, সেখানে মসজিদ কম্পনের কথা নেই। আলবানীও এ হাদিছকে দূর্বল বলেছেন। মুসনাদে আবী ইয়ালাও এ হাদিছকে দূর্বল বলেছেন।
৪. বুখারী শরিফে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: “নবী ইরশাদ করেন, যখন ইমাম ‘আমীন’ বলে, তখন তোমরা আমীন বলবে; কেননা যার ‘আমীন’ ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্ববর্তী সকল পাপকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিছ নং: ৭৮০; মুুসলিম, হাদিছ নং: ৪১০; মালিক, খ-২, পৃ. ১১৯) ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদিছটি হাসান সহিহ। (তিরমিযী, খ-১, পৃ. ৩৩৪)
এ হাদিছ দ্বারা বুঝা যায় ইমাম সাহেব আমীন বড় কর পড়বে।
জবাব: আল্লামা নীমবী আছারুস সুনানে এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, এখানে বলা হয়েছে, যখন ইমাম ‘আমীন’ বলবে, তখন ‘আমীন’ বল এবং তার থেকে বুখারী শরীফে এসেছে যখন ইমাম ‘দাল্লীন’ বলবে, তখন আমীন’ বল। তাই পারস্পরিক দ্ব›দ্ব দেখা যাচ্ছে। তাই উভয় হাদিছের সমাধান দেওয়ার জন্য বলতে হবে এখানে ইমামের ‘আমীন’ বলা রূপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে তথা যখন ইমাম সাহেব ‘আমীন’ বলার ইচ্ছা করে বা তা বলার সময় আসে তথা দাল্লিন শেষ হয়। যেমন কুরআনে এসেছে, “যখন নামাজে দাঁড়াবার ইচ্ছা করবে তখন অযূ কর।” (আছারুস সুনান, পৃ. ১৩৭) যাতে উভয় বর্ণনায় আর কোনো দ্ব›দ্ব না থাকে এবং এটাই নেওয়া ভাল হবে যাতে ইমাম মুক্তাদির ‘আমীন’ একসঙ্গে হয়। কেননা, ইমাম মুক্তাদী ও ফেরেশতাদের ‘আমীন’ একসঙ্গে হওয়াই উত্তম। তখন এ হাদিছ দ্বারা বড় করে পড়া বুঝা যাবে না।
৫. ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, “হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যখন তিনি ‘দাল্লীন’ বলেছেন তখন ‘আমিন’ বলেছেন।” (ইবনু মাজাহ, হাদিছ নং: ৮৫৪)
এখানে শ্রবণ বড় করে বলার উপর বুঝায় না; কেননা, তা কাছে থাকলে আস্তে পড়লেও শ্রবণ করা যায়। অন্য বর্ণনায় তার থেকে যে বড় করে পড়ার কথা রয়েছে তা আসলে রাবী অর্থগত বর্ণনা দিয়েছেন তার বুঝা মতে। তাই তো হযরত আলী (রা.)-এর মাযহাব আস্তে পড়া। যেমন আবী ওয়ায়িলের বর্ণনায় গেছে।
৬. দ্বারে কুতনীতে হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে এসেছে, “রাসূলুল্লাহ যখন দাল্লীন বলতেন, তখন বড় আওয়াজে আমীন বলতেন।” (দ্বারু কুতুনী, হাদিছ নং: ১২৭২) এটা দিয়েও দলিল দেওয়া যাবে না; কেননা, হযরত ওমরের আমল আস্তে পড়া যেমন পূর্বে তা গেছে। তাই তা থেকে মাঝে মধ্যে তালিমের জন্য করেছেন বলা হবে।
৭. বুখারী শরিফে তালিক সূত্রে আতা থেকে এসেছে, “আতা বলেন, আমীন দোয়া। ইবনে জুবাইর ও তার পেছনের লোকেরা ‘আমীন’ বলেছেন। এমনকি মসজিদে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে এবং আবু হুরাইরা (রা.) ইমামকে ডাক দিতেন আপনি যেন ‘আমীন’ দিয়ে আমার আগে না বাড়েন।” (বুখারী, খ-১, পৃ. ১৯৮)।
এখানে কিছু সাহাবাদের আমলের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু অধিকাংশ সাহাবাদের আমল ছিল আস্তে পড়া; তাই এটি দিয়ে দলিল দেওয়া যাবে না।
সারকথা হলো তথা বর্ণনার দিকে দুই মাযহাবই সমান; বরং হানাফী মাযহাবটি প্রাধান্য; কেননা, শুবা ‘তাদলিস’ করেন না; সুফিয়ান তাদলিস করেন। আর অর্থের দিক দিয়ে হানাফীদের দলিল মযবুত; কেননা তা কুরআনের আয়াতের সাথে দোয়ার মূলনীতিতে সামঞ্জস্য রাখে এবং হাদিছে এসেছে, জামে মামরে হাসান থেকে বর্ণিত, গোপনে দোয়া করা প্রকাশ্যে সত্তর বার দোয়া করার সমান। (মামর, জামিউ মামর, হাদিছ নং: ১৯৬৪৫; আসবাহানী, আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, খ-২, পৃ. ২৬১)
ইবনে হিব্বানে এসেছে, আমীন আউযুবিল্লাহ থেকে উত্তম নয়; কেননা আউযুবিল্লাহ পড়ার জন্য তো কুরআনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু আমীন পড়ার জন্য কুরআনে নির্দেশ নেই; বরং প্রসিদ্ধ মত মতে তা আরবী শব্দও নয়। তাই যখন আউযুবিল্লাহ আস্তে পড়ি ‘আমীন’ কেন আস্তে পড়ব না। মুক্তাদি তো কোনো কিছু বড় করে পড়ে না; তাই এটাও আস্তে পড়বে এবং আস্তে পড়াটা যুক্তি ভিত্তিক এবং অধিকাংশ সাহাবা ও তাবেয়ীদের আমল তাই ছিল। যেমন জওহরে নকী কিতাবে এসেছে, সঠিক কথা হলো, দুটিই জায়েজ। যদিও আস্তে পড়া উত্তম; কেননা, অধিকাংশ সাহাবা ও তাবেয়ীনের আমল তাই ছিল। (আল জওহারুন নকী, খ-২, পৃ. ৫৮)
আল্লামা আনোয়ারশাহ কাশ্মীরী (রহ.) আরও বলেন, এমন কোনো হাদিছ পাওয়া যাবে না যেখানে রাসূলুল্লাহ আমীন বড় করে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন; বরং যারা পড়েছেন প্রত্যেকে তারা নিজের রায় দ্বারা পড়েছেন। আর সুফিয়ানের হাদিছ বলেন বা শুবার হাদিছ বলেন, কোনোটি রাসূলের নিয়মিত ‘আমীন’ বলা বুঝায় না; বরং তারা কোন একসময় দেখেছেন বা শুনেছেন তা বর্ণনা করেছেন। কেননা, ওয়ায়িল ইয়ামনী ছিলেন। তিনি সেখান থেকে মাত্র কয়েকবার মদীনায় এসেছেন। তাই আমরা উভয় প্রকার হাদিছ দ্বারা উভয় প্রকারভাবে পড়া জায়েয মনে করি। কিন্তু লাগাতার এভাবে পড়া হাদিছ দ্বারা বুঝা যায় না। তাই আমরা তা কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ করে বলি আস্তে ও বড় করে পড়া উভয়টি জায়েয; তবে যেহেতু আমীন দোয়া এবং দোয়ার মূল ও আসল হলো নীরবে করা; তাই নীরবে পড়া উত্তম ও সুন্নাত হবে। (ফয়যুল বারী, খ-৩, পৃ. ৬৭)
মুসলিম উম্মাহর চলার পথ: আমীন পড়ার ব্যাপারে যে সকল হাদিছ বিশুদ্ধ তা আস্তে বা বড় করে পড়ার ব্যাপারে স্পষ্ট নয়, আর যে সকল হাদিছ আস্তে বা বড় করে পড়ার ব্যাপারে স্পষ্ট তা দূর্বল। সুফিয়ান ও শুবার হাদিছ দুটি সমান বিশুদ্ধ ও মুজতারিব। এই দুই হাদিছ দ্বারা কোনো একটিকে সুন্নাত প্রমাণ করা যাবে না, জায়েয প্রমাণ করা যাবে। তবে অধিকাংশ সাহাবাদের আমল ও দোয়ার সুন্নাত আস্তে পড়া হিসেবে তাও অন্যান্য যিকর ও দোয়ার মত আস্তে পড়া সুন্নাত হবে। তবে কমপক্ষে নিজে শুনে মত আওয়াজ হওয়া চায়। বড় করে পড়া জায়েজ হবে। তাই এ সাধারণ বিষয় নিয়ে ফিতনা সৃষ্টি করা অনুত্তম হবে। যেহেতু দুটোই শরীয়তে স্বীকৃত; তাই যে অঞ্চলে যে সুন্নাহ প্রচলিত সেখানে সেটিই চলতে দেওয়া উচিত। প্রচলিত সুন্নাহকে প্রত্যাখান করে তার স্থলে ভিন্ন সুন্নাহ জারি করার প্রচেষ্টা শরীয়তের নীতি ও স্বভাবের পরিপন্থী। মুসলমানদের ঐক্য ও শৃঙ্খলার পক্ষেও ক্ষতিকর। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয় বিদআতের ক্ষেত্রে; সুন্নাহর ক্ষেত্রে নয়। তাই প্রান্তিকতা পরিত্যাজ্য।

Comments
Post a Comment